কান্তুদা, আমি যেদিন শহরে ছিলাম না, আর সেদিনই তুমি চলে গেলে অন্যপাড়ে, চিরতরে ! ভালই করেছো। ৪০/৪২ টি বছরতো বয়েছো অন্ধ, ভিক্ষুক জীবন। আর কত বইবে এমন জীবনের দুঃসহ জ্বালা। আর কতইবা জ্বালাবে শহরের মানুষদের। শহরের চেনা মানুষ তোমাকে পছন্দ করতো না। কারণ ভিক্ষে না দিলে মাঝে মাঝেই তুমি হুট করে রেগে যেতে, বলে ফেলতে ‘বাজে কথা’। তারা তোমাকে এভাবে দেখতে দেখতেই সময় পার করেছে।
জানি না তুমি মরে যাওয়ায় কজন কষ্ট পেয়েছে। বিশ্বাস করো কান্তু দা, আমি পেয়েছি। তুমি নেই, সাক্ষ্যটাইবা কে দেবে মাছরাঙা টিভির সাংবাদিক লাবু ভাই ছাড়া ( Gazi Woazed Alam Labu)।
বার কিংবা চৌদ্দ বছর আগে তুমি একদিন দীর্ঘ সময় নিয়ে আমাদের দুজনের কাছে খুলে বলেছিলে বুকে জমানো কষ্ট সমুদ্রের কথা। তখন বাইরে প্রবল বৃষ্টি ছিল, আর তোমার দিকে তাক করে চালু ছিল সে সময়ের বড় সাইজের ভিডিও ক্যামেরা। তোমার সেদিনের স্মৃতিচারণ থেকেই লিখছি।
যে বছর তোমার অন্ধত্ব, তখন তুমি ২৫ বছরের টগবগে তরুণ। কলেরার ভয়ে যেদিন ময়মনসিংহের দাওয়ার কাজ ফেলে পালিয়ে মানিকগঞ্জের বাড়ি এলে সেদিনই গুটিবসন্তে মরে যাওয়া তোমার মা, বোনকে চিতায় তোলা হয়েছিল। আর তার পরের সাতদিনে গুটিবসন্তের থাবায় চিতার আগুনে উঠেছিল তোমার চার-চারটি ভাই। কেবল বেঁচে রইলে তুমি কিন্তু হিংস্র গুটিবসন্ত তোমার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়ে গেলো চিরদিনের জন্য।
তোমার নাম হয়ে গেল “কান্তুকানা”। তখন তোমার একমাত্র আশ্রয় কমাস আগে বিয়ে করা কিশোরী বউ মিনুদাসী । অন্ধজীবনে সংসারের ঘানি টানতে সেই যে ভিক্ষায় নামলে, থামলে এই দিন দুপুরে। তোমার অন্ধজীবনের সংসার আলো করে এসেছিল ছেলে বিজয়। মেট্রো টেইলার্সে পেটে-ভাতে দরজির কাজ শেখা শেষে প্রথম মাসের বেতন তুলেছিল ৬০০টাকা।
সেই একবার মাত্র, তারপর হটাৎ করেই পক্ষাঘাতে থেমে যায় বিজয়, সে এখন শারীরিক প্রতিবন্ধী। মেয়ে সুশীলা, সেও কদিনের জ্বরে হাড়-মাংসের জড়বস্তু। তোমার নিত্যদিনের লাঠি ঠুকে ঠুকে শহরচষা ভিক্ষায় জীবন চলতো এদের, তুমিই চালাতে।
এসব কজন জানে কান্তুদা, জানতেইবা চাইতো কজন। তাইতো তুমি সেদিন বলেছিলে, সবাই আমার মেজাজটাই দেখে, অন্তরের জ্বালাটা দেখে না। কান্তুদা সেদিন যন্ত্রনার সাগর পেড়িয়ে অনেক আনন্দের গানও তুমি শুনিয়েছিলে। বলেছিলে শেষ সিনেমা কবে দেখেছিলে, কে ছিল নায়ক নায়িকা। বলেছিলে বউ মিনুদাসীর টুকরো টুকরো গল্প, দেখতে কেমন সব। থাক সেসব।
যারা তোমাকে ভুল বুঝে শুধু বকেই গেল তাদের জন্য এত কথা লিখলাম কান্তুদা। আর কী দেবার আছে তোমাকে, কিচ্ছু নেই। পরপারে ভাল থাকো কান্তুদা, স্বস্তিতে ঘুমাও। তোমার শহর স্বস্তিতে নেই, ভাল নেই এখন।
লেখক-সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু, সহকারী অধ্যাপক খানবাহাদুর আওলাদ হোসেন খান কলেজ।
Leave a Reply