স্টাফ রিপোর্টার।
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে মধ্য দিয়ে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে।
গত শনিবার (২৪মে) সকলে জেলা প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ি প্রাঙ্গনে কবি নজরুল ইসলাম ও কবি পত্নী আশালতা সেনগুপ্তা প্রমিলার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এরপর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রা শেষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী দিনব্যাপী কবিতা আবৃতি, নাটক, গল্প ও রচনা প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হয়।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে মানিকগঞ্জের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক সানজিদা জেসমিন,নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড. নিরঞ্জন অধিকারী, সাবেক জেল শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল মোন্নাফ খান ও কৃষিবিদ রফিকুল ইসলামসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা, নজরুল একাডেমির সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গরা উপস্থিত ছিলেন।
নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড.নিরঞ্জন অধিকারী,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত তেওতা গ্রামে নজরুল-প্রমিলা বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল হবেষণা কেন্দ্র ও মিউজিয়াম নির্মানের দাবি করেন। একই সাথে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কবি পত্নী আশালতা সেন গুপ্ত প্রমিলার স্মৃতিবিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়ি সংস্কার এবং পুকুর ঘাট রক্ষনাবেক্ষনে সরকারের কাছে জোর দাবি করেন।
নজরুল গবেষক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,১৯০৮ সালে শিবালয়ের তেওতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে দোলন বা দুলি। আশালতা সেনগুপ্তা ছিলেন বাবা বসন্ত কুমার ও মা গিরিবালা দেবীর একমাত্র সন্তান। তার বাবা বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত ত্রিপুরায় নায়েব এর পদে চাকরি করতেন। তার কাকা ইন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত ত্রিপুরায় কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ইন্সপেক্টর ছিলেন। চাকরি সূত্রে আশালতার বাবা বসন্ত কুমার পরিবার নিয়ে তেওতায় বসবাস করতেন এবং তার কাকা ইন্দ্র কুমার পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন কুমিল্লায়। কিন্তু হঠাৎ করে বসন্ত কুমারের মৃত্যু হলে কাকা ইন্দ্র কুমার সঙ্গে কুমিল্লায় চলে যান আশালতা ও তার মা গিরিবালা বেদী। এরমধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম তার বন্ধু আলী আকবর খানের সাথে একবার কুমিল্লায় বেড়াতে যান এবং সেখানে ইন্দ্র কুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে আশালতার সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় হয়। এরপর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর আশলতা সেনগুপ্তার টানে ৫বার কুমিল্লায় যান কাজী নজরুল ইসলাম এবং তিন আসেন তেওতা গ্রামে। এরপর কাজী নজরুর ইসলাম জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কুমিল্লায় গেলে তাদের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হলে সামাজিক চাপে মা গিরিবালা দেবী মেয়ে আশালতা সেনগুপ্তাকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। এরপর ১৯২৪ সালে গিরিবালা দেবীর ইচ্ছায় নজরুল ও আশালতার বিয়ে হয়। প্রেমের সম্পর্কের সময় আশালতা সেনগুপ্তাকে প্রমিলা নামে ডাকতেন কাজী নজরুল ইসলাম। আর তেওতা জমিদার বাড়ির পাশে ছিলো আশালতা সেনগুপ্তা প্রমিলার বাড়ি।
সূত্র আরও জানান,শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে বিদ্রোহী, প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার পত্নী আশালতা সেনগুপ্তা প্রমিলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বিয়ের পরও কাজী নজরুল ইসলাম ও আশালতা সেনগুপ্তা প্রমিলা বেশ কয়েকবার তেওতা গ্রামে এসেছিলেন। তেওতা জমিদার বাড়ির শান বাঁধানো পুকুরে নজরুল ইসলাম সাঁতার কেটেছেন। পুকুর পাড়ের বকুল গাছের তলায় বসে বাঁশি বাজিয়েছেন। এমনকি জমিদার বাড়ির নবরত্ন মঠের দোল উৎসবেও যোগ দিয়েছিলেন। সবুজ শ্যামল তেওতা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা নদী। তেওতা গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাই তো তিনি লিখেছিলেন, আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী এ কোন সোনার গাঁয়। প্রমিলার প্রতি মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায় কে যায়। এছাড়াও তেওতায় বসে লিখেছিলেন ছোট হিটলার, লিচু চোর ও হারা ছেলের চিঠি। এসবের মাধ্যমে নজরুল ইসলাম তেওতা গ্রামের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া ‘ছোট হিটলার, লিচু চোর ও হারা ছেলের চিঠি’তে কবি ফুটিয়ে তুলেছেন তেওতা গ্রামের প্রতিচ্ছবি।
Leave a Reply