নিজস্ব প্রতিবেদন,
টানা সাত দিন পেরিয়ে গেলেও অপহৃত কলেজছাত্র রিদয়ন আনসারীকে (২৫) উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি মুক্তিপণের টাকা দেওয়ার পরও ছেলেকে ফিরে না পাওয়ায় চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও কান্নায় দিন পার করছে রিদয়ানের পরিবার। একমাত্র ছোট ভাইকে সুস্থভাবে ফিরে পেতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বড় ভাই শাহরিয়ার আনসারী। সন্তান ফিরে আসার প্রহর গুনতে গুনতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মা শারমিন আক্তার। ছেলের শূন্যতায় স্তব্ধ পুরো পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত প্রহর অপেক্ষা করলে এই বিভীষিকা থেকে মুক্তি মিলবে?
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের তাড়াইল গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নান আনসারীর ছেলে রিদয়ন আনসারী। রাজধানীর নিউ ইস্কাটন এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থেকে বিবিএ পড়ার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ অপহরণকারীদের নির্মম জিম্মিদশার শিকার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিদয়নের বড় ভাই শাহরিয়ার আনসারী বলেন, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও গত ছয় দিনে আমার ভাইটার কোনো সন্ধান মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা আজও আমাদের সান্ত্বনা দিতে পারল না। ছোট ভাইয়ের এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে মা ক্রমান্বয়েই শয্যাশায়ী হয়ে পড়ছেন। ভাইকে খুঁজে না পাওয়ায় একেকটি দিন আমাদের কাছে এক যুগের মতো মনে হচ্ছে। পরিবারের কারো মুখেই খাবার উঠছে না। আকুতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রশাসনই আমাদের শেষ ভরসা—দয়া করে আমার ভাইকে জীবিত উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়,গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানাধীন সফিপুর এলাকায় বড় বোনের বাসা থেকে ঢাকার মগবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন রিদয়ান। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে বড় ভাই শাহরিয়ার আনসারীর সঙ্গে শেষ কথা হয় তাঁর। এরপর থেকেই তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। স্বজনেরা রাতভর বিভিন্ন হাসপাতাল ও সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাননি।
পরদিন রবিবার (২৫ অক্টোবর) ভোর ৫টা ৩৯ মিনিটে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে শাহরিয়ার আনসারীর মোবাইলে কল আসে। অপহরণকারীরা রিদয়ানকে জিম্মি করার কথা জানিয়ে প্রমাণস্বরূপ কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাঁর সঙ্গে স্বজনদের কথা বলিয়ে দেয়। এ সময় রিদয়ানকে জীবিত ফেরত পেতে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা। জীবন বাঁচাতে স্বজনেরা বাধ্য হয়ে অপহরণকারীদের দেওয়া বিভিন্ন বিকাশ ও নগদ নম্বরে মোট ৪০ হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরও অপরাধীরা তাঁকে মুক্তি দেয়নি।
এঘটনায় ভুক্তভোগীর খালাতো ভাই ফয়সল মাহমুদ গত ২৫ অক্টোবর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং- ১৭৪৯) করেন। পরবর্তীতে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ ও অপহৃতকে উদ্ধারে র্যাব-৩ (খিলগাঁও ক্যাম্প)-এর কোম্পানি কমান্ডার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়। আত্মীয়স্বজন ও সহপাঠীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাহায্য চেয়ে আকুল আবেদন জানালেও এখন পর্যন্ত রিদয়ানের কোনো সন্ধান মেলেনি।
এদিকে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়ার ছয় দিন অতিবাহিত হলেও কলেজছাত্রকে উদ্ধার করা সম্ভব না হওয়ায় স্থানীয় এলাকাবাসী ও সহপাঠীদের মধ্যেও চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের আকুল আবেদন—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন দ্রুততম সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রিদয়ানকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে পরিবারের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
Leave a Reply