জাহিদুল হক চন্দনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৩টি জেলার সাথে রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহ বিভাগ এবং উত্তরাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের বিকল্প ‘লাইফলাইন’ হিসেবে ২০২২ সালে আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-৫০৬) নির্মান কাজ শুরু হয় । প্রায় ৫৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০ দশমিক ৩০ মিটার চওড়া চার লেনের উপযোগী এই মহাসড়কটি ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-টাঙ্গাইল জাতীয় মহাসড়কের যানজট এড়ানোর অন্যতম কৌশলগত বাইপাস। মানিকগঞ্জের শিবালয়, ঘিওর, দৌলতপুর ও টাঙ্গাইলের নাগরপুর, দেলদুয়ার ,টাঙ্গাইল সদর এই ৬টি উপজেলার কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি হাতে নেয় সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর। তবে যোগাযোগের পথ সুগম করার এই প্রকল্প এখন রূপ নিয়েছে সরকারি অর্থ লোপাট ও অনিয়মের আখড়ায়।
বিগত চার বছরে কয়েক ধাপে প্রকল্প এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধান,তথ্য অধিকার আইনে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরের নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক জাহিদুল হক চন্দন। অনুসন্ধানে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির আড়ালে সরকারি কোষাগারের অর্থ লুটের এক নজিরবিহীন চিত্র উঠে এসেছে। পাঠকদের জন্য তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে ১৬শ কোটির মহাসড়কে অনিয়মের প্রথম পর্ব।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী কাজের সরেজমিন পরিমাপ ও ‘কার্য-সম্পাদন সনদ’ ছাড়া বিল পাসের সুযোগ নেই। কিন্তু এ প্রকল্পে কোনো প্রকার পরিমাপ বা সনদ ছাড়াই ম্যানুয়াল ‘হস্ত রশিদের’ মাধ্যমে ৬ জন ঠিকাদারকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ১৩ কোটি ৭৫ লক্ষ ৬৫ হাজার ৪৫৮ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)’ কে ২২ জুন ২০২৩ তারিখে একটিমাত্র হস্ত রশিদে (ভাউচার নং-২৪৮) এককভাবে ১০ কোটি ৫৬ লক্ষ ২ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধ করা হয়। বাজেটের টাকা ফেরত যাওয়া ঠেকাতে এই বিল পাসের অছিলা দেওয়া হলেও আইএমইডি ও অডিট দল একে “গুরুতর আর্থিক অপরাধ” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রিজিড পেভমেন্ট (ঢালাই সড়ক) নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশার অতিরিক্ত এমএস বার (রড) প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করে ঠিকাদারের সাথে চুক্তি করা হয়। আইএমইডির পরিদর্শনের তথ্যানুযায়ী সরেজমিনে কাজ যাচাই ছাড়া প্রাক্কলনে অতিরিক্ত রড দেখিয়ে ঠিকাদারকে ১৮ লক্ষ ৯৫ হাজার ৮৮৮ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে, যা সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয়।
নির্মাণকালীন সড়ক চালু রাখার সুবিধার্থে সাময়িক রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছিল। রক্ষণাবেক্ষণ কাজের প্রাক্কলনে নির্দিষ্ট ইটের ব্যবহারের হিসাব ডিঙিয়ে কাল্পনিক ও অনিয়মিতভাবে ৪ লক্ষ ৩৯ হাজার ৫১২ টাকা অতিরিক্ত বিল ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়, যার কোনো মেজারমেন্ট বুক (এমবি) নেই।
পুরাতন রাস্তা খননের পর উঠে আসা সরকারি পাথর, খোয়া ও বিটুমিনাস মালামাল (স্যালভেজ সামগ্রী) ঠিকাদার নিজস্ব কাজে ব্যবহার করলে তার মূল্য বিল থেকে কাটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু টাঙ্গাইল অংশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড’-এর আইপিসি-২ বিল থেকে স্যালভেজ মালামালের নির্ধারিত ৪৪ লক্ষ ৭৬ হাজার ৪৪০ টাকা না কেটেই অর্থ ছাড় করেছেন সওজ কর্মকর্তারা।
সড়কের ডিবিএস বেস কোর্সে স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত অতিরিক্ত পুরুত্ব প্রাক্কলনে দেখিয়ে ঠিকাদারের সাথে চুক্তি করা হয় এবং তাকে ৮ লক্ষ ৬২ হাজার ৪৪১ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয় । চুক্তির স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা ভেঙে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ডিএনকো লিমিটেড’ প্রকল্পের কাজের কোনো নিরাপত্তা বিমা করেনি। সওজ কর্মকর্তারা এটি গোপন রেখে তাদের নিয়মিত বিল দিয়ে গেছেন। অডিট আপত্তির পর পরবর্তীতে ৯ লক্ষ ৩০,৭৫৭ টাকা কর্তন করা হয় । একইভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিই এবং ডিএনকো লিমিটেড-এর রানিং বিল থেকেও ব্যবহৃত পুরাতন স্যালভেজ মালামালের মূল্য ২৯ লক্ষ ৮৫ হাজার ৮২২ টাকা যথাসময়ে কেটে না রেখে পরিশোধ করা হয়।
ভূমি অধিগ্রহণের পর মহাসড়কের জায়গার কাটা গাছপালা ও ভেঙে ফেলা সরকারি স্থাপনার নিলাম প্রক্রিয়ার নির্ধারিত ১০% অংশ অর্থাৎ ৪ কোটি ৩৩ লক্ষ ৯৭ হাজার ৮৭৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়নি । ঠিকাদারদের ব্যবহৃত স্যালভেজ মালামালের মূল্যের ওপর সরকার প্রাপ্য ৭ লক্ষ ৯ হাজার ৯২৭ টাকা ভ্যাট ও আয়কর ঠিকাদারদের চলমান বিল (প্যাকেজ WP-3 ও WP-4) থেকে কর্তন করা হয়নি । এলএ কেসের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সড়ক বিভাগের কোনো আইনি এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও নিয়ম লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ২% আনুষঙ্গিক খরচের নামে সরকারি কোষাগার থেকে ৫ কোটি ৬৪ লক্ষ ৪৬ হাজার ৩৭৯ টাকা ছাড় করা হয়েছে।
ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান মোস্তাফিজ বলেন, সড়ক বিভাগ থেকে ম্যানুয়ালি বিল নেওয়ার কোন পদ্ধতি নেই। প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি নিয়ম কানুন অনুসরন করেই বিল নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোন ব্যতয় ঘটে থাকলে সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।
চুক্তির (WP-02/টাঙ্গাইল লিংক রোড) বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও কোনো বিমা পলিসি ছাড়া কাজ চালিয়ে বিল তোলা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে ‘ডিএনকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এস এম খোরশেদ আলম বলেন, বিমা পলিসির একটা ইস্যু নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিলো। তবে সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে কেউ এমন অভিযোগের বিষয়ে আমাদের জানায়নি।
‘হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড এর টাঙ্গাইল এর প্রজেক্ট ম্যানেজার মাসুদ সরকার বলেন, স্যালভেজের যে দর নির্ধারন করা থাকে তা প্রথম বিলেই সড়ক বিভাগ কেটে নিয়ে যায়। ফলে এমন অনিয়মের সুযোগ নেই।
মেসার্স মীর ব্রাদার্স – মোজাহার এন্টারপ্রাইজ (প্রাঃ) লিঃ(জেভি) মোজাহার এন্টারপ্রাইজ (প্রাঃ) লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মোজাহারুল হকের মুঠোফোনে কল দিলে সেটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো: শাহরিয়ার আলম টাঙ্গাইলে বদলি হয়েছেন। তিনি বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরন করে বিল প্রদান করা হয়েছে। কোন ধরনের অনিয়ম হওয়ার সুযোগ নেই। আইএমইডি এ বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন জানানো হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে জবাব দেওয়া হবে। পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জানালে তিনি জানান, বিষয়টি পরিকল্পনা কমিশন অনুমোদনের সময় যাচাই বাছাই করেই অনুমোদন দিয়েছেন। আরো অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরে তথ্য দিবেন বলে জানালেও কোন জবাব দেননি।
টাঙ্গাইল থেকে সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী ড.সিনথিয়া আজমিরী খান বদলি হয়ে ঢাকা সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেছেন । এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি থাকালীন সময়ে কোন অনিয়ম, ব্যতয় ঘটেনি। আইএমইডি থেকে যারা মূল্যায়ন করেছেন তারা তো আর এক্সপার্ট(বিশেষজ্ঞ) না। আমাদের নিয়মতি অডিট হয়।
প্রকল্পের শুরুতে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ বছর ৯ মাস এ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওই সময়ের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: সবুজ উদ্দিন খান। তাকে অনিয়মের পুরো বিষয়টি তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, খাতা কলমে ওই প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বিল প্রদানের পুরো বিষয়টি মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগ করেছে।
এরপর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার মাস দায়িত্ব পালন করেন ওই সময়ের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রকৌশলী সৈয়দ আসলাম আলী। তারপর থেকে এখন পর্যণ্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রকৌশলী এ কে এম আজাদ রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। এসব অনিয়মের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তাকেও ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে প্রশ্ন লিখে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোন জবাব দেননি।
আইএমইডি’র পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সেক্টর-২ এর উপপরিচালক (উপসচিব) সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-৫০৬) যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ” প্রকল্পের নিবীড় পরিবীক্ষন প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের নানা অসঙ্গতির বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখনো কোন জবাব পাওয়া যায়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিল পরিশোধ, কাজের যথাযথ পরিমাপ ও যাচাই ছাড়া অর্থ ছাড় এবং সরকারি সম্পদের মূল্য আদায় না করার মতো অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, বিল পরিশোধ ও অডিট আপত্তির বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা যায়।
সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো: মনিরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করেন এ প্রতিবেদক। তিনি সকল প্রশ্ন লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। পরে তাকে সকল প্রশ্ন লিখে দেওয়ার পর একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোন জবাব বা বক্তব্য দেননি।
জাতীয় সংসদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য (সংসদ সদস্য পিরোজপুর-৩) মো:রুহুল আমীন দুলাল বলেন, এসকল অভিযোগ বা অনিয়ম সম্পর্কে আমি অবগত নই। আগামী স্থায়ী কমিটির সভায় বিষয়টি তুলে ধরবো। যদি এই প্রকল্পে কোন অসঙ্গতি থাকে তাহলে যথাযথভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ কোন অনিয়ম করে থাকলে বিধি মোতাবেক সে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
Leave a Reply