১৬শ কোটির মহাসড়কে অনিয়ম: ২য় পর্ব
জাহিদুল হক চন্দনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
এক হাজার ৬৩৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকার আরিচা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার সাভার-নবীনগর এবং টাঙ্গাইলের প্রধান প্রধান মহাসড়কের ট্রাফিক চাপ কমানো। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই দায়িত্বশীলদের চরম উদাসীনতা, খণ্ডকালীন জনবল দিয়ে প্রকল্প পরিচালনা এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ছাড়াই তৈরি করা ভুল নকশার কারণে পুরো মেগা প্রকল্পটি এখন দুর্ঘটনার কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছে। আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-৫০৬) নিয়ে জাহিদুল হক চন্দনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা অনিয়ম,অসঙ্গতি। পাঠকদের জন্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে ২য় পর্ব।
সড়ক বিভাগ জানায়, প্রকল্পের পূর্ত ও নির্মাণকাজ প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক বিবেচনায় WP-01 থেকে WP-10 পর্যন্ত ১০টি পৃথক প্যাকেজে ভাগ করে চুক্তি সম্পাদন করা হয়। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতাধীন ১৭.৫০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে WP-01 প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ৩০৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে, টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগের আওতাধীন বাকি ৯টি প্যাকেজের মোট চুক্তিমূল্য ৫৯৬ কোটি ৩ লাখ টাকা। টাঙ্গাইল অংশের উল্লেখযোগ্য প্যাকেজগুলোর মধ্যে ৫.২৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ টাঙ্গাইল লিংক রোড নির্মাণে WP-02 প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ১১২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এ ছাড়া WP-03 প্যাকেজে ৫৯ কোটি ৫৬ লাখ, WP-04 প্যাকেজে ৬৪ কোটি, পাঁচটি সেতু নির্মাণে WP-09 প্যাকেজে ৪৪ কোটি ৯৭ লাখ এবং আরও পাঁচটি সেতু নির্মাণে WP-10 প্যাকেজে ৩৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
হয়নি অডিট, নেই পূর্ণকালীন পিডি।
একটি মেগা প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার লেনদেন স্বচ্ছ রাখতে নিয়মিত ‘অভ্যন্তরীণ অডিট’ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রকল্পের গত চার বছরে সওজ কর্তৃপক্ষ কোনো অভ্যন্তরীণ অডিট সম্পন্ন করেনি। ফলে হস্ত রশিদে বিল ছাড়ের মতো অনিয়মগুলো ধামাচাপা পড়ে থাকে। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক্সটার্নাল অডিট টিম মোট ২৪ কোটি ৯৭ লক্ষ ১০ হাজার ৫০১ টাকার ১০টি গুরুতর আপত্তি তোলে, যার ৯টিই চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত নিষ্পত্তিহীন। বিধি অনুযায়ী ১৬শ কোটি টাকার প্রকল্পে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রয়োজন। অথচ ৪ বছর ৪ মাসের বাস্তবায়নকালে কোনো পূর্ণকালীন পিডি ছিল না। ৩ বার পিডি পরিবর্তন করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন কর্মকর্তাই (মোঃ সবুজ উদ্দিন খান, সৈয়দ আসলাম আলী এবং বর্তমান পিডি এ. কে. এম. আজাদ রহমান) সওজের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োজিত থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্প চালিয়েছেন।
তদারকি সভার নামে ফাঁকিবাজি, দায়সারা ফিজিবিলিটি।
উন্নয়ন পরিপত্রের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৩ মাস পর পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) ১৭টি সভা হওয়ার কথা ছিল। অথচ প্রকল্প কর্মকর্তারা মে ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র ৬টি সভা সম্পন্ন করে তদারকিতে চরম ফাঁকি দিয়েছেন। পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশিকা অমান্য করে কোনো নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ পরামর্শক দ্বারা বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফ্যাজিবিলিটি স্টাডি) করানো হয়নি। সওজ নিজেরা সংক্ষেপে সমীক্ষা শেষ করায় সড়কের হাইড্রোলজিক্যাল ও কারিগরি নকশায় মারাত্মক ত্রুটি রয়ে গেছে।
সংযোগস্থলে ‘অ্যাপ্রোচ স্ল্যাব’ বাদ, ১০.৩০ মিটার সড়কে সরু (৭.৩০ মিটার) ব্রিজ।
প্রকল্পের পিসি গার্ডার সেতুগুলোর সংযোগস্থলে গাড়ি ঝাঁকুনি প্রতিরোধক কোনো ‘অ্যাপ্রোচ স্ল্যাব’ নকশায় রাখা হয়নি। এর ফলে সেতুতে ওঠানামার সময় তীব্র গতির যানবাহন প্রচণ্ড ঝাঁকুনির মুখে পড়বে এবং সেতুর আবুটমেন্ট (ভিত্তি) ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মহাসড়কের মূল পেভমেন্ট চওড়া করে ১০.৩০ মিটার করা হলেও মাঝের পুরাতন সেতু ও কালভার্টগুলো আগের মতোই মাত্র ৭.৩০ মিটার সরু রেখে দেওয়া হয়েছে। ১০.৩০ মিটার চওড়া রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে আসা যানবাহনগুলো সরু সেতুর মুখে হঠাৎ প্রবেশ করতে গিয়ে ‘বোতল-নেক’ ও মুখোমুখি সংঘর্ষের শিকার হতে পারে।
নিচু ও ত্রুটিযুক্ত আন্ডারপাস, বৈজ্ঞানিক ইউ–টার্নের অভাব।
নকশায় আন্ডারপাসের উচ্চতা রাখা হয়েছে মাত্র ৪.০ থেকে ৫.০ মিটার। ফলে ভবিষ্যতে ওভারলোডেড মালবাহী ট্রাক, ক্রেন এবং ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি আটকে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। টাঙ্গাইল থেকে আরিচাগামী যানবাহনের জন্য মূল জাতীয় মহাসড়কে (এন৫) কোনো বৈজ্ঞানিক ইউ-টার্ন রাখা হয়নি। কেবল একটি ঝুঁকিপূর্ণ মিডিয়ান ওপেনিং রাখা হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বাতিল মালামালের তথ্য গোপন,ডাইভারশনে নেই কোনো সিগন্যালম্যান।
ঠিকাদারের সাইট ল্যাবে টেস্টে অনুত্তীর্ণ বা ফেল করা নির্মাণ সামগ্রীর জন্য সুনির্দিষ্ট ‘স্ট্যাক ইয়ার্ড’ বা রেজিস্টার খাতা রাখা হয়নি। মূল ল্যাব রেজিস্টারেও কোনো ফেইলড টেস্টন রিপোর্ট নথিভুক্ত না করায় অনুত্তীর্ণ নিম্নমানের রড ও পাথর গোপনে সড়কে ব্যবহারের পথ সুগম করা হয়েছে। সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের সময় বিকল্প ডাইভারশন রোডে নিরাপত্তার জন্য কোনো ট্রাফিক সিগনালম্যান নিয়োগ করা হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত যানবাহন খাদে পড়া ও পথচারী দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
জমি অধিগ্রহণে ধীরগতি , হুমকির মুখে নিলুয়া বিল।
সওজ ও জেলা প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতায় মানিকগঞ্জ অংশে ভূমি অধিগ্রহণে ১ বছর এবং টাঙ্গাইল অংশে ১৪ মাস বিলম্ব হয়। ফলে ব্যয় না বাড়লেও মেয়াদ ২৪ মাস বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জমি হারিয়ে দীর্ঘ ৪ বছর ধরে সরকারি ক্ষতিপূরণ না পেয়ে অনেকেই ভোগান্তিতে পড়েছেন। নিলুয়া বিলের পাশ ঘেঁষে সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি ওই অংশে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। বিলসংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের নির্মাণকাজের ফলে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ, পানিপ্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ইয়াসমিন বানু খন্দকার বলেন, “সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ছোট কালভার্ট থাকলেও পানির স্বাভাবিক গতিপথে বিঘ্ন ঘটবে। এতে প্রাণিবৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বিলের ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিলুয়া বিলটি বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে মাছের প্রজনন ও জীবনচক্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক, পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট এর পরিচালক অধ্যাপক ড.হাসিব মোহম্মদ আহসান বলেন, “একটি মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই হবে না, এর সঙ্গে সেতু, কালভার্ট, সংযোগস্থল ও যানবাহন চলাচলের নিরাপত্তার বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশস্ত সড়কের মাঝখানে সরু সেতু বা কালভার্ট থাকলে যানবাহনের গতি ও চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। সেতুর দুই প্রান্তে যথাযথ অ্যাপ্রোচ ব্যবস্থা না থাকলেও যানবাহনের ঝাঁকুনি এবং কাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ কারিগরি সমীক্ষা, নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন করা জরুরি। নকশায় কোনো ত্রুটি থাকলে তা নির্মাণের আগেই চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। আর নির্মাণকাজ শেষ হয়ে গেলেও সড়ক ও সেতুর নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ছাড়পত্র) মাসুদ ইকবাল মো:শামীম বলেন, ইআইএ করা হলে পরিবেশগত ক্ষতিগুলো নিরুপন করা যায়। আরিচা (বরঙ্গাইল)-ঘিওর-দৌলতপুর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-৫০৬) নির্মান কাজ নিয়ে কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি। যদি এ প্রকল্পের কারনে নিলুয়া বিল এলাকায় ক্ষতি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
টাঙ্গাইল থেকে সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী ড.সিনথিয়া আজমিরী খান বদলি হয়ে ঢাকা সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বছর অভ্যন্তরীণ অডিট হয়ে থাকে।আইএমইডি’র প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীন অডিট হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে জানালে তিনি বলেন, এমন হওয়ার কথা না, হয়তো তারা বুঝতে পারেননি। পরিবেশগত মূল্যায়ণ ছাড়া কিভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এমন বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি অনেক পুরোনো। তখন এখনকার মতো হয়তো এতো গুরুত্ব দিয়ে ইআইএ দেখা হতোনা। যেভাবে সেতু ও সড়কের ডিজাইন দেওয়া হয়েছে সেভাবে সড়ক ও সেতুর নির্মান হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বড় উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি অপরিহার্য। প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা না হওয়া, নিরীক্ষা আপত্তি দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা এবং নিয়মিত তদারকির ঘাটতি থাকলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে নিরীক্ষা আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা, অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ করা জনগণের অর্থের প্রতিটি টাকার ব্যবহার সম্পর্কে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, প্রকল্পটি পুরোপুরি দেখভাল করছে সড়ক বিভাগ। প্রকল্পটি নিয়ে কোন অভিযোগ কেউ করেনি। যদি কোন অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
Leave a Reply